ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে শত শত কোটি ডলারের ফেডারেল অনুদান ও ঋণছাড় স্থগিত করা হয়েছে। গত সোমবার মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের এক প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এরই মধ্যে অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব অনুভব করার কথা জানিয়েছে অনেক সংস্থা ও রাজ্য সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সার্বিকভাবে অথনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের স্বাক্ষরিত দুই পৃষ্ঠা ও এক হাজারের কম শব্দের ওই নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি অর্থায়ন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। মার্ক্সবাদী সমতা, ট্রান্সজেন্ডারবাদ বা গ্রিন নিউ ডিলের (জিএনডি) মতো পরিবেশবাদী নীতি বাস্তবায়নে সরকারি অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্দেশনার অস্পষ্টতা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। ফেডারেল অর্থায়নের আওতাভুক্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা, কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা, ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রের তহবিল ও পরিজনহীন মৃত প্রবীণ সৈনিকদের কফিনের খরচ জোগানো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে এক ফেডারেল বিচারক অর্থায়ন স্থগিতাদেশের কিছু অংশ সাময়িকভাবে বাতিল করেন।
এ নির্দেশনার আওতায় নাগরিকদের স্বাস্থ্যবীমার জন্য দেয়া অর্থসহায়তাও বন্ধ হবে কিনা তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেনি হোয়াইট হাউজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, তবে এটা স্পষ্ট, সরকারি অর্থপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে মার্কিন অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থ ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ দেশটির আইনসভা কংগ্রেসের হাতে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নিতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা একে অবৈধ বলছেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক স্যামুয়েল ব্যাগেনস্টোস বলেন, ‘নির্বাহী শাখা নির্দিষ্ট কিছু কারণে সরকারি অর্থব্যয় স্থগিত করতে পারে। কিন্তু কোনো নীতির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের দ্বিমত থাকা সেসব কারণের মধ্যে পড়ে না।’
বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে ট্রাম্প তার লক্ষ্য অর্জনে কতটা ঝুঁকি নিতে রাজি। তার এ নির্দেশনা জারির মাধ্যমে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্টের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত চার বছরে বারবার মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। তবে প্রতি বছরই তা উতরে গেছে দেশটি। দুই বছর মূল্যস্ফীতি ও সুদহার বাড়তি থাকলেও শ্রমবাজার শক্তিশালী ছিল। নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেশটির অর্থনীতি ভালো অবস্থায় নেই না বলে প্রচার করছিলেন ট্রাম্প। তবে পরিসংখ্যান বলছে, মার্কিন অর্থনীতি এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসায় সুদহার কমছে। ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ায় টানা দুই প্রান্তিকে ৩ শতাংশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেডারেল অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারালে এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা হারালেও একই ঘটনা ঘটবে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ওয়েন্ডি এডেলবার্গ বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব নাও ফেলতে পারে। তবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের জন্য এটি বিশাল আঘাত।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি যদি এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে খুব সামান্যই সমস্যা তৈরি হবে। তবে পাঁচ সপ্তাহ পার হলে শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের পরিস্থিতিকেও এটি বিপদে ফেলতে পারে।’
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, এ আদেশ সব ফেডারেল কর্মসূচির জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং এর মাধ্যমে আগের ডেমোক্রেটিক পার্টি যেসব নীতি গ্রহণ করেছিল, সেগুলোর অর্থায়ন বাতিল হয়েছে। তবে এটি বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, স্বাস্থ্যবীমা বাবদ সরকারি অর্থসহায়তা (মেডিকেড) এ আদেশের আওতায় পড়বে না। কিন্তু কয়েকটি রাজ্যের মেডিকেড সংস্থা জানিয়েছে, তারা হাসপাতাল, চিকিৎসক ও বীমা কোম্পানির জন্য তহবিল হারিয়েছেন।
ফেডারেল অনুদান ও ঋণ প্রদান স্থগিতের সমালোচনা করে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেসের সিনিয়র ডিরেক্টর ব্রেন্ডন ডিউক বলেন, ‘ট্রাম্প আগে নীতি ঠিক করতে পারতেন। তিনি কার্যত একতরফাভাবে ফেডারেল সরকারের আংশিক শাটডাউন ঘোষণা করেছেন।’
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন এডুকেশন অ্যান্ড দ্য ওয়ার্কফোর্সের গবেষণা পরিচালক জ্যাক ম্যাবেল বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করছি আমাদের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার কতটা চাপ সহ্য করতে পারে। এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে।’